ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) অবশেষে তাদের মিগ-২১ বহরকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সপ্তাহান্তে তারা এই বিমানকে অবসরে পাঠাবে। টানা ৬০ বছরেরও বেশি সময় সেবার পর এই যুদ্ধ বিমানের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত নিল দেশটির বিমানবাহিনী। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের (লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্করণ চেংদু জে-৭) পর ভারত ছিল এই যুদ্ধবিমানের অন্যতম প্রধান ব্যবহারকারী দেশ।
১৯৬৩ সালে মিগ-২১ ভারতীয় বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয় এবং তখন থেকে নিয়মিত সক্রিয় ছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয় যখন ভারতীয় যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের বালাকোটে জইশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। ওই সময় পাকিস্তানের এক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেন আইএএফ-এর উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান, আর তিনি নিজেই তখন চালাচ্ছিলেন একটি মিগ-২১ বিসন।
আইকনিক এই যুদ্ধবিমান ভারতের আকাশকে বহু বড় সংঘাতে সুরক্ষা দিয়েছে। তার বিদায় ভারতীয় ফাইটার পাইলটদের কয়েক প্রজন্মের কাছে আবেগঘন মুহূর্ত। ভারতীয় গণমাধ্যমে ভরপুর রয়েছে অভিজ্ঞ পাইলট ও বিমানযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণায়।
এই লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে আছে মিগ-২১–এর সঙ্গে। ১৯৭৪ সালে এই বিমানে তিনি যুদ্ধবিমানের কৌশল শিখেছিলেন এবং ১৯৯৬-২০০০ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় মিগ-২১ আধুনিকায়ন প্রকল্পের দলনেতা ছিলেন।
মিগ-২১ ডিজাইন করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিকোইয়ান-গুরেভিচ ডিজাইন ব্যুরো। এটি ছিল একটি সুপারসনিক ইন্টারসেপ্টর জেট। সোভিয়েতরা তখন বিপুলসংখ্যক হালকা, নির্ভরযোগ্য ও সহজ যুদ্ধবিমান তৈরি করতে চেয়েছিল—যেমন কৌশল তারা একে-৪৭ রাইফেলের ক্ষেত্রেও নিয়েছিল।
৪ মহাদেশের ৬০টিরও বেশি দেশ মিগ-২১ উড়িয়েছে। আজও কয়েকটি ছোট দেশ ব্যবহার করছে, এর প্রথম উড্ডয়ন হয়েছিল ৬৫ বছর আগে। এটি একাধিক বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল—সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত সুপারসনিক জেট (১১,৪৯৬), কোরিয়ান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি তৈরি যুদ্ধবিমান এবং একসময় দীর্ঘতম সময় ধরে উৎপাদিত যুদ্ধবিমান (যা পরে এফ-১৫ ও এফ-১৬ ছাড়িয়ে যায়)।
১৯৫০–এর দশকে নকশা শুরু হয়, প্রথম ডেল্টা-উইং প্রোটোটাইপ ইয়-৪ উড়ে ১৬ জুন ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে মস্কোর তুশিনো এয়ারশোতে প্রথম প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়।
মিগ-২১ ছিল প্রথম সোভিয়েত বিমান যেখানে ফাইটার ও ইন্টারসেপ্টর দুই ক্ষমতাই ছিল। এটি ছিল হালকা ওজনের, ম্যাক ২ গতিসম্পন্ন ফাইটার। তবে এর রেঞ্জ ছিল সীমিত। এর সহজ ইঞ্জিন, অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও সুবিধাজনক ছিল।
সর্বোচ্চ গতি: ২,২৩৭ কিমি/ঘণ্টা (উচ্চতায়), সেবা উচ্চতা ১৭,৫০০ মিটার। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল ২৩ মিমি কামান ও পাঁচটি হার্ডপয়েন্টে ২,০০০ কেজি পর্যন্ত বোমা, রকেট বা মিসাইল বহনের সক্ষমতা। পরবর্তী সংস্করণগুলোতে আর-৭৩, আর-৭৭ ও আর-২৭ মিসাইল যুক্ত হয়। কম উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কারণে বহু দেশ এটি কিনেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরি হয় মোট ১০,৬৪৫টি বিমান, ভারতীয় হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (এইচএএল) তৈরি করেছে আরও ৬৫৭টি।
১৯৬১ সালে ভারত পশ্চিমাদের প্রস্তাব বাতিল করে মিগ-২১ কেনে। ১৯৬৩ সাল থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয় ১,২০০-রও বেশি মিগ। এভাবে এটি ছিল আইএএফ-এর প্রথম সুপারসনিক জেট।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মিগ-২১ ভারতীয় বাহিনীকে আকাশসীমায় প্রাধান্য এনে দেয়। ঢাকার তেজগাঁও ও কুর্মিটোলায় বারবার হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ চারটি মিগ-২১ গভর্নর হাউসে হামলা চালায়, যার পরেই পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ পথ প্রশস্ত হয়।
এরপর ইরাকসহ বহু দেশ ভারত থেকে মিগ-২১ চালনার প্রশিক্ষণ নেয়। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল বড় সমস্যা। ১৯৭০ সাল থেকে ১৭০ জন ভারতীয় পাইলট ও ৪০ জন বেসামরিক লোক নিহত হন দুর্ঘটনায়।
