সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক মাধমে ‘ভোটারদের মাঝে নগদ টাকা বিতরণের সময় জনতার তোপের মুখে জামায়াত নেতা’ এমন শিরোনামে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দাবি করা হয় কাজী নূরুল ইসলাম নামের ওই জামায়াত নেতা ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণ করেন। টাকা বিতরণের সময় তার সঙ্গে উপজেলা জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল আলমসহ আরও কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
ভাইরাল হওয়া ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, তিনজন ব্যক্তি ক্যামেরার দিকে হাত উঁচু করে এক হাজার ও পাঁচশো টাকার নোট দেখাচ্ছেন। ভিডিওতে শোনা যায়, কয়েকজন বলতে থাকেন—“টেহা দিছে, এই যে টেহা দিছে।”
তবে সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় সাংবাদিক, পুলিশ, বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভিডিওতে ফুলহাতা সাদা শার্ট পরিহিত যে ব্যক্তি এক হাজার টাকার নোট দেখাচ্ছেন, তার নাম বৈ খাঁ। তার বাবার নাম মেগবর খাঁ। তিনি স্থানীয় বিএনপি কর্মী। হলুদ শার্ট ও কালো জ্যাকেট পরা যে ব্যক্তি এক হাতে মোবাইলে কথা বলতে বলতে অন্য হাতে পাঁচশো টাকার নোট প্রদর্শন করছেন, তার নাম ইসমাইল। তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
ভিডিওর আরেক অংশে দেখা যায়, হলুদ গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা এক যুবক পাঁচশো টাকার নোট হাতে নিয়ে এক বৃদ্ধের হাতে গুঁজে দিচ্ছেন। ওই যুবকের নাম শামীম। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত খাঁ দ্য ডিসেন্টকে জানান, শামীম একই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি।
যার হাতে শামীম পাঁচশো টাকার দুটি নোট তুলে দেন, তার নাম নুরুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে একাধিক স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ভিডিওতে আরও দেখা যায় লাবু খাঁকে—লাল দাড়ি ও ক্যাপ পরিহিত এই ব্যক্তি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। তাকে অন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা গেলেও কারো হাতে টাকা দিতে দেখা যায়নি। ভিডিওর একদম শুরুতে পাঞ্জাবি পরা লাল দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে মোবাইলে কথা বলতে বলতে সামনে এগিয়ে যেতে দেখা যায়; তিনি জামায়াতের ইউনিয়ন সভাপতি কাজী নুরুল ইসলাম।
ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল—তা জানতে দ্য ডিসেন্ট সাড়ে চার মিনিটের আরেকটি ভিডিও সংগ্রহ করে। ভিডিওতে একটি বাড়ির উঠানে দুই পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ চলতে দেখা যায়। সেখানে জামায়াতের এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আপনার এরকম করলেন কেন? আপনাদের কাজে কি আমরা বাধা দিছি? আপনারা আমাদের এলাকায় গিয়া মিছিল-মিটিং করেন না?”
এর জবাবে বিএনপি পক্ষের এক বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, “ভোট চাইবেন, মিটিং করবেন কিয়েরে? সভাপতির বাড়িতে এসে আপনারা… এখানে সভাপতির বাড়ি আছে।”
পরে জামায়াতের ওই ব্যক্তিকে আবার বলতে শোনা যায়, “আমাদের ইউনিয়ন সভাপতির বাড়ির কাছে মিটিং করেন না আপনারা? আমরা কি আপনাদের কোথাও বাধা দিছি কখনো? চেয়ার দিয়া বাড়ি দিলো, উনাকে কেন চেয়ার দিয়া বাড়ি দিল?”
স্থানীয় একাধিক সাংবাদিক জানান, বুধবার সকাল ১০টার দিকে অর্জুনা ইউনিয়নের জগতপুরা গ্রামের মধ্যপাড়ায় ভোটের গণসংযোগে যান জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এ কার্যক্রমের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি কাজী নুরুল ইসলাম এবং উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খাঁ। গণসংযোগের একপর্যায়ে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে এসে মিটিং করতে বাধা দেন। ওই সময়ই সাড়ে চার মিনিটের ভিডিওটি ধারণ করা হয়।
এদিকে এক ভিডিও বার্তায় সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, তিনি অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক মোহাম্মদ রবিউল আলাম। সাবেক উপজেলা জামাত আমির ও বর্তমান সাংগঠনিক সেক্রেটারি তিনি।
রবিউল আলম অভিযোগ করেন, উর্জরা ইউনিয়নে ভোট প্রচারের সময় নিয়ামত আলী মাস্টারের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন হামলাকারী তাদের আক্রমণ করে। বিএনপি নেতার এলাকায় জামাতের প্রবেশ অবরোধ করে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে উস্কানি দেয়। প্রতিবাদ করায় সঙ্গী মুরিদ জামানাকে চেয়ার দিয়ে মারধর, তারপর রবিউলকে মাফলার দিয়ে শ্বাসরোধ, টেনে নিয়ে দাড়ি টেনে বুক-গলা-মাথায় মারধর করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘটনা ঢাকতে তারা নিজেদের টাকা বিতরণ করে ‘ভোটের টাকা’র মিথ্যা অভিযোগ করে, মোবাইল ছিনতাই করে ভিডিও ডিলিট, হ্যান্ডমাইক ও ঘড়ি ভাঙছে। অশ্লীল গালাগাল করে। অডিও-ভিডিও প্রমাণ আছে।’
ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাব্বির রহমান বলেন, “জামায়াতের চারজন লোক সেখানে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গেলে স্থানীয় বিএনপির লোকজন তাদের হ্যান্ডমাইক ছিঁড়ে ফেলে এবং একজনের ফোন কেড়ে নেয়। পরে ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়। সেখানে জামায়াতের লোকজন টাকা-পয়সা বিলায়নি। বিএনপি সমর্থকরাই টাকা বের করে ভিডিও করেছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসান জানান, ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, জুডিশিয়ারি ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্তে যা পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রাজিব হোসেন বলেন, “আমরা সরেজমিনে গিয়ে যা বুঝেছি, সেখানে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। তবে একেক পক্ষ একেক রকম দাবি করছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের চোখের সামনে কোনো ঘটনা না ঘটলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।”
